একটা নির্দিষ্ট সাহিত্য বা সংস্কৃতির সাহায্য নিলে ভাষা শেখাটা অনেক সহজ হয়৷ সাহিত্যের অন্য ক্ষেত্রের কথা জানিনা, কিন্তু গান ব্যাপারটা মানুষের ভাবের সাথে এমনভাবে মিশে আছে, তাকে কিছুতেই আলাদা করা যায় না। আর গান পছন্দ করে না (আমি শুধু লিরিকাল গানের কথা বলছি না; সুর, পাখির ডাক, দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ— এ সবই গান) এমন মানুষের সাথে আমার আজ পর্যন্ত দেখা হয় নি। মনে করে দেখুন, ছোট্টবেলায় অমনোযোগে শোনা একটা গানের কথাগুলো আপনার এখনও মনে আছে। এখন, ভাষার ক্ষেত্রে গান কীভাবে কাজ করবে? পড়ার চেয়ে গান মনে রাখা সহজ কি-না বলুন? আমরা তখনই কোনো কিছু ভালভাবে শিখি যখন তা প্রেক্টিক্যালি শিখি৷ বাচ্চাদের শুরুতে পুতুল, আপেল আর বল দিয়ে শব্দ শেখানো হয় যাতে তার পরিচিত গণ্ডি থেকে সে কল্পনা করতে পারে। তাতে পুরো ব্যাপারটা মাথায় ঢোকে বেশি।
কয়েকটা খটমটে শব্দ শেখার নাম ভাষা শেখা না। মুখস্ত করাটা ভাষা শেখার উপায় না, একটা মাধ্যম শুধু। ভাষা আপনি তখনই শিখবেন, যখন শব্দগুলো বলার বা শোনার সময় সেগুলো কল্পনায় দেখতে পারবেন; বা অনুভব করতে পারবেন। গান আমদের অবচেতনভাবে ভাষা শেখায়। আর শেখাটাকে দ্রুতও করে। চাঁদ শব্দটা বিশেষ্য না অব্যয়, সেটা জানার আগে আমরা জেনেছি চাঁদ নামক গোল চকচকে বস্তুটা আকাশে থাকে, আর কোনো এক সম্পর্কের লতায় পাতায় সে আমাদের মামা হয়। গানে সুবিধা হল, ব্যকরণ বইয়ের মতো সে কেবল একটা একঘেয়ে প্যাটার্ন মেনে চলে না। সে আপন গতিতে চলতে থাকে। তাই আপনি যখন ব্যকরণ শিখতে শিখতে হাঁপিয়ে উঠছেন, তখন একটা গান বেছে নিন। অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে যাবেন না যেন! তাহলে মাথা ঘুরবে দ্বিগুণ উৎসাহে। আগে শুনুন। সুরটা পছন্দ হচ্ছে? আর বাদ্যবাজনা? সব ঠিকঠাক? সুরটা বুকের কোথাও গিয়ে বাধছে? তাহলে ঠিকাছে৷ পেয়ে গেছেন! এবার শুনতে থাকুন। যতবার ভাল লাগে। ২/১ টা শব্দ আন্দাজ করার চেষ্টা করুন আপনার নড়বড়ে ভোকাবুলারি থেকে। কী? একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করলেন একেবারে নতুন অজানা ভাষার একটা গানের সুরে নিজেকে গুনগুন করতে? এবারে আপনার কৌতুহল যখন আর দমন করতে পারছেন না, কী বলে যাচ্ছে গায়ক এমন করুণ সুরে, আমাকে জানতেই হবে; নইলে আর শান্তি হচ্ছে না!— এমন যদি হয় অবস্থা, তবে এবার আপনি অর্থসহ লিরিক্স খুঁজে লিখে ফেলুন খাতায়। শুধু অর্থটা পড়ুন। বুঝুন। এবার ওই ভাষার লাইনের সাথে মেলান। এটুকু হলে শব্দগুলো বিশ্লেষণ করুন। শব্দের উৎস বা বেইজ ফর্ম খুঁজুন। কিভাবে পরিবর্তন হল, খেয়াল করুন। তবে হ্যাঁ, সব একসাথে মুখস্থ করতে যাবেন না যেন৷ ও এমনিই আত্মস্থ হয়ে যাবে। সময় নিন। এ তো গেল পড়া আর শোনার অনুশীলন। শুধু ওটুকু করলেই তো আর হবে না। ভাষা তো বলতেও হবে, নাকি? আর যদি কোনোরকম বৃটিশ উচ্চারণে বাঙলা বলার মতো উচ্চারণেই আপনি সন্তুষ্ট থাকেন, তবে আর কিছু বলার নেই। কিন্তু যদি সেই ভাষার আঞ্চলিকরা যেভাবে দ্রুত গতিতে, তাদের নিজস্ব ছন্দে (সেই ছন্দ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে আপনি চট্টগ্রাম, ঢাকা, নোয়াখালী, বরিশাল বা অন্য যেকোনো আঞ্চলিক ভাষার পার্থক্যেই নিশ্চয়ই ধরতে পারছেন?), নিজস্ব স্বতন্ত্র উচ্চারণে কথা বলে, আপনি সেভাবে বলতে চান, তাহলে শুরু থেকেই সেভাবে বলা শিখতে হবে। আবার বলছি, শুরু থেকেই সেভাবে ‘বলা’ শিখতে হবে। মানে আপনি উচ্চস্বরে মুখ, জিহবা, দাঁত যথেষ্ট বা যথেষ্টর বেশি ব্যবহার করে বলবেন। বলে বলে নিখুঁত করবেন। এক্ষত্রে গান বা কবিতা আপনাকে বিশেষ সহায়তা দেবে। শুধু শুনবেন না, লিরিক্স দেখে দেখে গানগুলো আপনি করবেনও; উচ্চস্বরে৷ সুর হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না একদম। কিন্তু শব্দগুলোর নিখুঁত উচ্চারণের দিকে কড়া নজর রাখবেন। বাড়লো তো আপনার শব্দভাণ্ডার অবচেতনভাবে?


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
কী ভাবছেন?